দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতীয় নির্বাচন একাধারে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর থেকে এই অঞ্চলের দেশগুলো—ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ—গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে নানাবিধ চড়াই-উতরাই অতিক্রম করেছে।
এই অঞ্চলের নির্বাচনী প্রক্রিয়াগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, দেশগুলোর স্বাধীনতার পর থেকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, পেশীশক্তির দাপট এবং পদ্ধতিগত কারচুপির এক দীর্ঘ ইতিহাস বিদ্যমান। নির্বাচন কেবলমাত্র সরকার পরিবর্তনের একটি সাংবিধানিক পদ্ধতি নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এটি প্রায়শই সামাজিক আধিপত্য রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ বণ্টনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার একটি জীবন-মরণ লড়াই হিসেবে আবির্ভূত হয়।
নির্বাচনী সততা ও অবাধ নির্বাচনের বিবর্তনীয় বিশ্লেষণ
দক্ষিণ এশিয়ায় নির্বাচনী সততা (Electoral Integrity) পরিমাপের ক্ষেত্রে 'বৈচিত্র্যময় গণতন্ত্র' (V-Dem) সূচক একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। ভারতের মতো দেশে দীর্ঘকাল ধরে নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্থিতিশীল থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে 'নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র' (Electoral Autocracy) বা 'চাপের মুখে থাকা গণতন্ত্রের' প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানে নির্বাচনের সুষ্ঠুতা সরাসরি রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়েছে।
বাংলাদেশ: তত্ত্বাবধায়ক বনাম দলীয় শাসনব্যবস্থা
১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত চারটি নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু হিসেবে স্বীকৃত হয়েছিল। তবে ২০১১ সালে এই ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলোতে নির্বাচনী সততার ব্যাপক অবনতি ঘটে।
| নির্বাচনী ব্যবস্থা | গড় ভোটার উপস্থিতি (%) | গড় নিহতের সংখ্যা | গুণগত মান |
|---|---|---|---|
| তত্ত্বাবধায়ক (১৯৯১-২০০৮) | ৭৩.৪৫% | ৪৫.৪ | উচ্চ (অবাধ) |
| দলীয় সরকার (২০১৪-২০২৪) | ৫৩.৪২% | ৫৩.৭ | নিম্ন (বিতর্কিত) |
ভারত: বৃহত্তম গণতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ সংকট
ভারত নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেও তার নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সততা সর্বদাই সংকটের ঊর্ধ্বে ছিল না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারত একটি 'স্ট্রেইনড ডেমোক্রেসি' বা চাপে থাকা গণতন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। যদিও ইভিএম ব্যবহারের মাধ্যমে গণনায় স্বচ্ছতা এসেছে, তবুও রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং শাসক দলের অনুকূলে রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের ব্যবহারের অভিযোগ গত এক দশকে তীব্র হয়েছে।
পাকিস্তান: সামরিক তদারকি ও ব্যর্থতা
পাকিস্তানের নির্বাচনী সততা একটি জটিল 'ওভারসাইট সিস্টেম' বা তদারকি ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়, যেখানে অসামরিক সরকারের ওপর সামরিক বাহিনীর প্রভাব অনস্বীকার্য। ১৯৭০ সালের নির্বাচন অবাধ হলেও ফলাফল মেনে না নেওয়ায় রাষ্ট্রীয় বিভাজন ঘটে। সাম্প্রতিক ২০২৪ সালের নির্বাচনেও পিটিআই-এর ওপর দমন-পীড়ন এবং ইন্টারনেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ নির্বাচনী সুষ্ঠুতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
নির্বাচনী সহিংসতার ধরন ও প্রকৃতি
১. রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা
ভারত, নেপাল এবং বাংলাদেশে স্থানীয় ক্যাডার বাহিনী বা 'পেশীশক্তি' ব্যবহার করে ভোটারদের প্রভাবিত করা হয়। তৃণমূল পর্যায়ে সংঘাত একটি নিয়মিত ঘটনা।
২. জঙ্গি আক্রমণ
পাকিস্তানে টিটিপি (TTP) বা আইএসের মতো উগ্রবাদী গোষ্ঠী নির্বাচনী সমাবেশগুলোতে আত্মঘাতী হামলা চালায়। ভারতের কাশ্মীর ও পাঞ্জাবেও এমন ইতিহাস রয়েছে।
৩. রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন
বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গণগ্রেপ্তার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ডিজিটাল সেন্সরশিপ এখন নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার নতুন হাতিয়ার।
দেশভিত্তিক হতাহত ও নিহতের পরিসংখ্যান (১৯৪৭-২০২৪)
বাংলাদেশ: রক্তক্ষয়ী পালাবদল
| সাল / সময়কাল | নিহত | প্রধান কারণ |
|---|---|---|
| ১৯৮৬ (৩য় সংসদ) | ৪০ জন | এরশাদ বিরোধী আন্দোলন |
| ২০০১ (৮ম সংসদ) | ৬৯ জন | নির্বাচন পরবর্তী সংখ্যালঘু নির্যাতন |
| ২০০৮ (৯ম সংসদ) | ১৩৮ জন | প্রচারণাকালীন সংঘাত |
| ২০২৪ (গণঅভ্যুত্থান) | ১৪০০+ জন | ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ওপর গুলি |
পাকিস্তান: সন্ত্রাসবাদ ও দাঙ্গা
| বছর | নিহত | কারণ |
|---|---|---|
| ১৯৭৭ | ৩৫০+ | কারচুপির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ |
| ২০০৮ | ৪০০+ | বেনজির ভুট্টো হত্যাকাণ্ড পরবর্তী দাঙ্গা |
| ২০১৩ | ২৪৭ | টিটিপি আত্মঘাতী হামলা |
নির্বাচনী সহিংসতায় নারীর অবস্থান
দক্ষিণ এশিয়ার নির্বাচনী সহিংসতার একটি অন্ধকার দিক হলো নারী প্রার্থীদের ওপর আক্রমণ। ইউএন ওমেন-এর ২০১৪ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, ভারত, নেপাল এবং পাকিস্তানে সহিংসতার ভয়ে ৬০ শতাংশ নারী রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পিছপা হন। প্রার্থীদের পরিবারকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং শ্লীলতাহানির হুমকি একটি সাধারণ কৌশল।
প্রযুক্তি ও নির্বাচনের ভবিষ্যৎ
ভারত ইভিএম ব্যবহারের মাধ্যমে গণনা প্রক্রিয়া দ্রুত করেছে। তবে এআই ব্যবহার করে গুজব ছড়ানো এবং 'ডিপ ফেক' ভিডিওর মাধ্যমে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার প্রবণতা আগামী দিনের নির্বাচনে সহিংসতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব ও ঝুঁকি: একটি বিশ্লেষণ
- ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের অভাব: রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে ব্যর্থ।
- পরিবারতন্ত্র: গান্ধী, ভুট্টো, শরীফ, হাসিনা, জিয়া ও রাজাপাকসে পরিবারের দীর্ঘকালীন আধিপত্য।
- মেরুকরণ: ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজনকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার।
- যুব অসন্তোষ: বেকারত্ব ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দিচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যদি তাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে সহিংসতামুক্ত এবং বিশ্বাসযোগ্য করতে না পারে, তবে এই অঞ্চলের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি চিরকাল ঝুঁকির মুখেই থেকে যাবে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব এবং শ্রীলঙ্কার 'আরাগলায়া' প্রমাণ করে যে, জনগণের ভোটাধিকার হরণ করলে তার পরিণতি হয় ভয়াবহ।
মূল তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:
LSE South Asia Centre, V-Dem Institute Democracy Reports, BRUR Comparative Analysis of Electoral Integrity, Gallup Pakistan Election Reports, Dhaka Tribune Election History, Amnesty International & Human Rights Watch Reports (2024-2025). বিস্তারিত তালিকা মূল নথিতে সংরক্ষিত।
